Uncategorized 1 min read

বন্ড বা স্ট্যাম্পে চুক্তি করে ৩ বা ৫ বছর চাকরি করার শর্তে নিয়োগ কি বৈধ?

চাকরির বন্ড নিয়ে প্রশ্ন আমরা প্রায়ই পাই। আমাদের দেশে বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এবং কিছু ব্যাংকে চাকরিতে প্রবেশের অন্যতম শর্ত থাকে, ৩ বা ৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে চাকরি ছাড়া যাবে না। ছাড়লে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা জরিমানা দেওয়ার শর্ত থাকে। অনেক প্রতিষ্ঠান আবার চেক নিয়ে রাখে এবং প্রার্থীর মূল সনদপত্র জমা রেখে দেয়। বন্ড বা স্ট্যাম্পে চুক্তি করিয়ে এভাবে চাকরিতে আটকে রাখা আইনসম্মত কি না, এবং এমন অবস্থায় আপনার করণীয় কী, তা এই লেখায় তুলে ধরলাম।

প্রতিযোগিতার বাজারে বেকারত্ব থেকে মুক্তি পেতে অনেকেই ভালোমন্দ বিবেচনা না করে চাকরিতে যোগ দেন। পরে ভালো চাকরির সুযোগ এলেও চুক্তিপত্র বা সনদ আটকে থাকার কারণে অন্য প্রতিষ্ঠানে যোগ দিতে পারেন না। এ ধরনের চুক্তির কারণে অনেক তরুণের ক্যারিয়ার হুমকির মুখে পড়ে।

জোর করে যেমন ভালোবাসা হয় না, তেমনি কাউকে নির্দিষ্ট মেয়াদের চুক্তিতে সই করিয়ে চাকরিতে থাকতে বাধ্য করা যায় না। জোর করে চাকরিতে আটকে রাখার এ ধরনের শর্ত আইনগতভাবে বলবৎযোগ্য নয় এবং সংবিধান ও শ্রম আইনের পরিপন্থী।

বন্ড, স্ট্যাম্প বা সনদপত্র আটকে রেখে চাকরি করানো কি আইনসম্মত?

কোনো প্রতিষ্ঠান কর্মীকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে চাকরি করাতে পারে না। এভাবে জোর করে কাজ করানোকে আইনে জবরদস্তিমূলক শ্রম বলে। কোনো কর্মীকে নির্দিষ্ট সময় চাকরিতে আটকে রাখতে তার সনদপত্র, চেক, স্ট্যাম্প বা বন্ড আটকে রাখা জবরদস্তিমূলক শ্রমের কাতারে পড়তে পারে, যা বেআইনি। তবে চুক্তিভিত্তিক চাকরিতে যোগ দিলে নোটিশ পিরিয়ড মেনেই চাকরি ছাড়তে হবে।

আইন কী বলে?

বাংলাদেশের সকল আইনের অভিভাবক সংবিধান। সংবিধানের ৩৪ অনুচ্ছেদে সকল প্রকার জবরদস্তিমূলক শ্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সাংবিধানিক এই নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন আইনের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য।

আন্তর্জাতিকভাবে জবরদস্তিমূলক শ্রম বিলোপের জন্য আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) ১৯৫৭ সালে “বলপ্রয়োগে শ্রম বিলোপ কনভেনশন” পাস করে। বাংলাদেশ ১৯৭২ সালে এই কনভেনশন অনুসমর্থন করে। তাই এটি বাস্তবায়ন করা বাংলাদেশের দায়িত্ব।

সেই প্রেক্ষিতে ২০০৬ সালে বাংলাদেশ শ্রম আইন প্রণয়ন করা হয়। শ্রম আইনের ২৭ ধারায় শ্রমিকের চাকরি ছাড়ার স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। কোনো শ্রমিক প্রতিষ্ঠান ছাড়তে চাইলে ২৭ ধারা অনুসরণ করে লিখিত নোটিশ দিয়ে পদত্যাগ করতে পারেন। কর্তৃপক্ষ পদত্যাগ অনুমোদন না করলেও নোটিশের সময় পার হলে, অথবা নোটিশের পরিবর্তে নির্ধারিত মজুরি দিলে শ্রমিকের দায় শেষ হয় এবং মালিক তাকে আর চাকরি করতে বাধ্য করতে পারেন না।

আইনবিধানআপনার জন্য অর্থ
সংবিধান, অনুচ্ছেদ ৩৪জবরদস্তিমূলক শ্রম নিষিদ্ধজোর করে চাকরিতে রাখা যায় না
শ্রম আইন, ২০০৬, ধারা ২৭নোটিশ দিয়ে পদত্যাগের অধিকারনোটিশ পিরিয়ড বা মজুরি দিয়ে চাকরি ছাড়া যায়
সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ধারা ২১ব্যক্তিগত সেবার চুক্তি আদালত বলবৎ করে নাআদালত চাকরিতে থাকতে বাধ্য করবে না
ILO কনভেনশন ১০৫বলপ্রয়োগে শ্রম বিলোপবাংলাদেশ ১৯৭২ সালে অনুসমর্থন করেছে

চাকরির বন্ড বা চুক্তিপত্র দিয়ে কি কোম্পানি মামলা করতে পারে?

সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ২১ ধারা অনুযায়ী ব্যক্তিগত সেবার এ ধরনের চুক্তি আদালতের মাধ্যমে বলবৎ করা যায় না, অর্থাৎ আদালত কাউকে চাকরিতে থাকতে বাধ্য করবে না। তাই এ ধরনের বন্ডের ভিত্তিতে চাকরিতে আটকে রাখার মামলায় কোম্পানির সফল হওয়ার সুযোগ খুবই কম। ভালো চাকরির সুযোগ থাকলে আইনগত ঝামেলার ভয়ে নিজের ভবিষ্যৎ আটকে রাখবেন না।

অনেকে প্রশ্ন করেন, কোম্পানি মামলা দিলে পরের চাকরিতে অসুবিধা হবে কি না? এ বিষয়ে পড়ুন মামলা থাকলে কি চাকরি হয় অথবা নিচের ভিডিওটি দেখুন।

বিনিয়োগ চুক্তির টাকা কি ফেরত দিতে হবে?

কোম্পানি কর্মীর পেশাগত উন্নয়ন, স্বাচ্ছন্দ্য ও সামাজিক অবস্থান বাড়াতে বিভিন্ন ধরনের বিনিয়োগ করে, যা কখনো নির্দিষ্ট সময় ওই প্রতিষ্ঠানে কাজ করার শর্তে দেওয়া হয়। যেমন:

  1. কর্মীকে ফ্ল্যাট বা গাড়ি কিনে দেওয়া
  2. বাড়ি তৈরিতে অর্থায়ন করা
  3. বিদেশে প্রশিক্ষণ বা বৃত্তিতে অর্থায়ন করা

যেহেতু কোম্পানি কর্মীকে নির্দিষ্ট সময় চাকরিতে রাখতে এসব অতিরিক্ত সুবিধা দিয়েছে, তাই মেয়াদ শেষের আগে চাকরি ছাড়লে চুক্তি অনুযায়ী কোম্পানির বিনিয়োগের যুক্তিসংগত অংশ ফেরত দিতে হয়। এ ধরনের চুক্তি আইনসম্মত। যেমন, ৫ বছরের মেয়াদের ৩ বছর পার হলে সাধারণত বাকি ২ বছরের আনুপাতিক অংশ ফেরত দিতে হয়।

চেক বা সার্টিফিকেট আটকে রাখলে কী করবেন?

  1. প্রতিষ্ঠান জোর করে তারিখবিহীন চেক বা স্ট্যাম্প নিয়ে থাকলে পুরো ঘটনার বিবরণ দিয়ে থানায় জিডি করুন এবং জিডির কপি সংরক্ষণ করুন।
  2. জিডির কপিসহ কাগজপত্র ও চেক ফেরত চেয়ে এবং চুক্তিটি অকার্যকর ঘোষণা করে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে লিগ্যাল নোটিশ পাঠান।
  3. ব্যাংকে চেক নম্বর উল্লেখ করে দরখাস্ত দিয়ে ওই চেকের লেনদেন বন্ধ (স্টপ পেমেন্ট) করুন। দরখাস্তের সাথে জিডি ও লিগ্যাল নোটিশের কপি দিন।
  4. নোটিশে সমাধান না হলে আদালতে মামলা করতে পারেন।

আমাদের অভিজ্ঞতায়, বেশিরভাগ কোম্পানি লিগ্যাল নোটিশ পেলে আইনি ঝামেলা এড়াতে বিষয়টি মিটিয়ে ফেলে।

চুক্তি সই করতেই হলে যেসব সতর্কতা নেবেন

  • চুক্তিতে অবশ্যই এক বা দুই মাসের নোটিশে চাকরি ছাড়ার শর্ত রাখুন।
  • মূল সনদপত্র যথাসম্ভব জমা দেবেন না। একান্ত বাধ্য হলে দিন এবং যে কর্মকর্তা কাগজ নিয়েছেন তার নাম উল্লেখ করে থানায় জিডি করুন।
  • তারিখবিহীন বা স্বাক্ষরিত ফাঁকা চেক দেবেন না।
  • চুক্তির একটি স্বাক্ষরিত কপি নিজের কাছে রাখুন।
  • অন্য কোথাও চাকরি হলে চুক্তি অনুযায়ী এক বা দুই মাস আগে লিখিত নোটিশ দিন। কাগজপত্র ফেরত না দিলে থানায় জানান এবং লিগ্যাল নোটিশ দিন।

চাকরির বন্ড নিয়ে সচরাচর জিজ্ঞাসা

চাকরির বন্ড ভেঙে চাকরি ছাড়লে কি জেল হয়?

না। শুধু বন্ড ভেঙে চাকরি ছাড়া ফৌজদারি অপরাধ নয়। তবে চুক্তিতে বৈধ প্রশিক্ষণ বা বিনিয়োগ খরচের শর্ত থাকলে তা ফেরতের দাবি উঠতে পারে।

কোম্পানি কি মূল সার্টিফিকেট আটকে রাখতে পারে?

কর্মীকে চাকরিতে আটকে রাখার উদ্দেশ্যে মূল সনদ আটকে রাখা আইনসম্মত নয়। জিডি করে লিগ্যাল নোটিশের মাধ্যমে ফেরত চাওয়া যায়।

কোম্পানি আমার চেক ব্যাংকে জমা দিলে কী হবে?

আগেই ব্যাংকে স্টপ পেমেন্টের আবেদন করে রাখুন এবং জিডি ও নোটিশের কপি সংরক্ষণ করুন। চেক মামলা হলে এসব কাগজ আপনার পক্ষে প্রমাণ হিসেবে কাজে লাগবে।

নোটিশ পিরিয়ড কত দিন?

বাংলাদেশ শ্রম আইনের ২৭ ধারায় স্থায়ী শ্রমিকের জন্য ৬০ দিন এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে ৩০ দিনের লিখিত নোটিশের বিধান আছে। নিয়োগপত্রে ভিন্ন শর্ত থাকলে তা দেখে নিন।

প্রশিক্ষণের খরচ কি ফেরত দিতে হয়?

চুক্তিতে স্পষ্ট শর্ত থাকলে এবং প্রতিষ্ঠান প্রকৃতই খরচ করে থাকলে মেয়াদের বাকি সময়ের আনুপাতিক অংশ ফেরত দিতে হতে পারে।

চাকরির বন্ড, আটকে রাখা সনদ বা চেক ফেরত পেতে লিগ্যাল নোটিশ ও আইনি পরামর্শের জন্য Ain Bisharod-এ অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন।

এই বিষয়ে আরও পড়ুন

Share:
LinkedIn WhatsApp
Author & Legal Counsel

Adv. Matin Sarkaer Mishuk

Matin Sarkaer Mishuk is a registered property lawyer of Bangladesh Supreme Court and expert at Real Estate & Property Law, Land Documents Vetting, Property Disputes, Management of private and Leasehold properties (RAJUK, MoHPW & NHA), Banking Law, Law of Inheritance and other matters with civil nature. Watch his property law videos on <a href="https://www.youtube.com/channel/UCv3PBDuEpIZcWjXWwGxByMQ" target="_blank" rel="noopener">YouTube</a>.

View All Articles by Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *